বঙ্গবন্ধুর প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

আপডেটঃ ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ০১, ২০২২

‘রাজনীতির কবি’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৫) চেতনায় ছিলেন ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। তাঁর সংগ্রামী জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন আবর্তিত হয়েছে নজরুলের কবিতা ও গানের আলোকে। তিনি সেই শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য থেকে আমৃত্যু ছিলন নজরুল-ভক্ত। বঙ্গবন্ধু নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতেন, গুনগুন করে তাঁর গান গাইতেন। তিনি ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি গ্রহণ করেছেন নজরুলের লেখা থেকে। নজরুলের লেখা ‘চল্ চল্ চল্’ গানকে তিনি করেছেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় ‘রণসঙ্গীত’। বঙ্গবন্ধুর নান্দনিক এবং বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ছিল নজরুলকে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে আনয়ন এবং নাগরিকত্ব ও ‘ডক্টরেট’ খেতাব প্রদান। বঙ্গবন্ধু ও নজরুল এবং বাংলাদেশ একই মাল্যে সৌরভে গৌরবে গ্রন্থিত।

॥২॥

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, শৈশবে- কৈশোরে, ছাত্রজীবনেই বঙ্গবন্ধু বিদ্রোহী কবি নজরুলের জীবন ও সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে অবহিত হন। নজরুল আটবার বৃহত্তর ফরিদপুর সফর করেছেন। বঙ্গবন্ধুর বয়স যখন পাঁচ বছর তখন নজরুল প্রথমবার (১৯২৫) ফরিদপুর সফর করেন। তখন গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার অংশ ছিল। বেবী মওদুদ সূত্রে জানা যায় যে, ১৯৩৭ সালে কিশোর মুজিব যখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র তখন তাঁর গৃহশিক্ষক কাজী আব্দুল হামিদ তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, সাংস্কৃতিক চিন্তা-ভাবনা ও রবীন্দ্র-নজরুলকে জানার আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন।১

॥৩॥

বঙ্গবন্ধু প্রত্যক্ষভাবে নজরুলের সংস্পর্শে আসেন ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে। ওই সময় তিনি সরাসরি নজরুলের গান শোনেন এবং তাঁকে ও অন্যান্যকে নিয়ে আন্দোলনের জড়িত হন। জানা যায়, নজরুল ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনের অধিবেশনে অতিথি হিসেবে যোগ দেন এবং ওই বৎসর তাঁর সঙ্গে ছিলেন অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাাঁ, মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ, মুহম্মদ শামসুল হুদা চৌধুরী ও আবদুর রউফ। কিন্তু প্রতিপক্ষের প্ররোচনায় এই সমাবেশের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা জারী করা হলে সাহিত্যিক রাজনীতিবিদ হুমায়ুন কবীরের বাড়িতে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মিলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তরুণ শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন:

“…. ফরিদপুর ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্সে শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁরা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন কবীর, ইব্রাহীম খাঁ সাহেব। সে সভা আমাদের করতে দিল না। ১৪৪ ধারা জারি করল। কনফারেন্স করলাম হুমায়ূন কবীর সাহেবের বাড়িতে। কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব গান শোনালেন…”২

॥৪॥

বঙ্গবন্ধুর চেতনায় সবসময় দীপ্র ছিলেন রবীন্দ্র-নজরুল। এমনকি তিনি পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছেও বাংলা ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন রচনা তুলে ধরতেন। ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী বছর ১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানে যান প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে রাজনৈতিক বিষয় আলোচনার জন্য। ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি লিখেছেন:

“বিকাল নয়টা রওয়ানা করলাম। শহীদ সাহেব গাড়ি চালালেন, আমি তাঁর পাশেই বসলাম। পিছনে আরও কয়েকজন ও এডভোকেট বসলেন। … এডভোকেট সাহেবরা আমাকে পূর্ব বাংলার অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। বাংলা ভাষাকে কেন আমরা রাষ্ট্রভাষা করতে চাই। … আমার কাছে তারা নজরুল ইসলামের কবিতা শুনতে চাইলেন। আমি তাঁদের … ‘কে বলে তোমায় ডাকাত বন্ধু’, ‘নারী’, ‘সাম্য’, আরো কয়েকটি কবিতার কিছু কিছু অংশ শুনালাম। কবিগুরু রীবন্দ্রনাথের কবিতাও দু’একটার কয়েক লাইন শুনালাম। শহীদ সাহেব তাঁদের ইংরেজি করে বুঝিয়ে দিলেন।”৩

॥৫॥

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ উত্তর পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ববঙ্গ প্রদেশে ভাষা আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য সম্পর্কে উচ্চকণ্ঠে সোচ্চার হন। ১৯৫৩ সালের ২৩ মে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ কর্তৃক রবীন্দ্র-নজরুল জন্মবার্ষিকী পালিত হয় ঢাকার মোগলটুলী প্রধান কার্যালয়ে। এসময় তরুণ রাজনীতিক শেখ মুজিবুর রহমান নজরুলের সংগ্রামী জীবন ও বিপ্লবী কবিতা এবং গান নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করে নতুন ইতিহাস তৈরি করেন। এই অনুষ্ঠানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক কাজী নজরুল ইসলামের ওপর লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করা হয়। বঙ্গবন্ধু ওই সময় রাজনৈতিক সফরে করাচী অবস্থান করায় প্রবন্ধটি পাঠ করেন মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। ১৯৫৩ সালের ১৮ জ্যৈষ্ঠ তারিখে সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে লেখা হয়:

“পূর্ব পাকিস্তানে- পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাতা জনাব শেখ মুজিবুর রহমান এই সময় করাচী থাকায় তাঁর প্রেরিত এক প্রবন্ধ জনাব মোশাররফ হোসেন চৌধুরী পাঠ করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি কবি নজরুল ইসলামের বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিদ্রোহী জীবনযাত্রার এক নিখুঁত আলোচনা রূপ প্রত্যক্ষ হয়। প্রবন্ধের উপসংসহারে বর্তমান শোণিত লোলুপ জগতের অত্যাচার ও অবিচারের কণ্ঠরোধের জন্য কবির বৈপ্লবিক জীবনাদর্শ ছাত্র-যুবক ও জনগণের কতখানি প্রয়োজন আছে তাহাই প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়।’’৪

অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠ অডিও (রেকর্ড) তাঁর ‘দরিদ্র’ কবিতা এবং নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, ‘কূলি মজুর’ ও ‘সর্বহারা’ পাঠ করা হয়।

২৪ মে, ১৯৭২ ঢাকায় ‘কবি ভবনে’ বঙ্গবন্ধু কাজী নজরুল ইসলামকে পুষ্পমাল্যে বরণ করছেন

॥৬॥

বঙ্গবন্ধু কবি নজরুলকে ভালোবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন তা জানা যায় নজুরুল গবেষক আসাদুল হক সূত্রে। তিনি লিখেছেন যে, ১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু কলকাতায় গেলে তিনি কবি নজরুলকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করেন। তখন আসাদুল হক ডেপুটি হাইকমিশনে চাকুরিরত। তিনি কলকাতাস্থ মনন্নথ দত্ত রোডে দোতলার ফ্ল্যাটে নজরুলের বাসগৃহে বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। আসাদুল হক লিখেছেন-

‘‘বঙ্গবন্ধু যখন নজরুলকে দেখতে যান তখন সঙ্গে নিয়ে যান একগুচ্ছ রজনীগন্ধা ও সন্দেশের একটি প্যাকেট। কবির বাসায় তিনি যখন যান তখন কবি শুয়ে বিশ্রাম করছিলেন। আগন্তুক প্রবেশ করতে দেখে কবি উঠে বসেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে হাত উঠিয়ে সালাম জানান এবং নজরুলের হাতে রজনীগন্ধার গুচ্ছ দেন। কবি হাত বাড়িয়ে তা গ্রহণ করেন।’’৫

॥৭॥

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও সাংস্কৃতিক চেতনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুলের কবিতা ও গান প্রায় সমভাবে উচ্চারিত হতো। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রমনা রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রদত্ত ভাষণেও তিনি এই দুই কবি সম্পর্কে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ও একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীদের হীনমন্যতার নিন্দা করেন। তিনি বলেন-

‘কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামকে উপেক্ষা করিয়া বাংলা সাহিত্যের কথা চিন্তা করাও পাপ। অথচ এদেশে রবীন্দ্রনাথ অপাঙক্তেয় ও নজরুল সাহিত্যকে ‘মুসলমানী’ করার নামে বিকৃত করার চেষ্টা হয়েছে।’৬

তাঁর একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায় অন্য একটি অনুষ্ঠানেও। বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭১ সালের ২৪ জানুয়ারি ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে ‘পূর্ব পাকিস্তান শিল্পী সমাজ’ সংবর্ধনা দেয় এবং এতে তাঁকে ‘বঙ্গ সংস্কৃতির অগ্রদূত’ খেতাব দেয়া হয়। প্রতি উত্তর ভাষণে বঙ্গবন্ধু দেশের গণমুখী সংস্কৃতি বিকাশের উপর জোর দেন। তিনি বলেন-
‘আপনারা ভালোবাসা এবং শান্তির অনেক গান গেয়েছেন। আজ সর্বহারা মানুষের জয়গান রচনার দিন এসেছে। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মতো বিপ্লবী গান গাইতে হবে।…. কোন বিশেষ মহল তথাকথিত ইসলামের নামে নজরুলের গান ও কবিতার শব্দ বদলেছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বাদ দিলে বাংলা সাহিত্যের অস্তিত্বটা যাবে কোথায়।’৭

॥৮॥

স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও অবদান হচ্ছে নজরুলকে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কালকাতা থেকে বাংলাদেশে এনে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করা। বঙ্গবন্ধু নজরুল ও তাঁর পরিবারের জন্য ধানমন্ডিতে একটি বাড়ি বরাদ্দ করেন। এই বাড়িতেই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে দেখতে যান। পরে কবির জন্য মাসিক ভাতা মঞ্জুর করা হয়। ঐ বছরই এক বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, নজরুল বাংলার বিদ্রোহী আস্থা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক রূপকার…।৮

১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলে কবি নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডিগ্রি ‘ডিলিট’ প্রদান করেন। ১৯৭৫ সালের ২২ জুলাই নজরুলের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের জন্য পিজি হাসপাতালে (১১৭ নং কেবিন) স্থানান্তরিত করা হয়। এই হাসপাতালেই কবির মৃত্যু ঘটে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১৩৮৩ সালের ২ ভাদ্র।)

॥৯॥

বঙ্গবন্ধু নজরুলের রচনাবলী সুযোগ পেলেই পাঠ করতেন বলে জানা যায়। তাঁর প্রিয় গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নজরুলের ‘নম নম বাংলাদেশ মম’।৯ নজরুল লিখেছেন ‘বাংলা বাঙালির হোক। বাংলার জয় হোক, বাঙালির জয় হোক আর বঙ্গবন্ধু শ্লোগান দিয়েছেন ‘জয় বাংলা’। নজরুল ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ (ভান্ডার গান কাব্যের অন্তর্ভূক্ত) কবিতায় জয় বাংলা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। গবেষক শামসুজ্জামান খান লিখেছেন, নজরুলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু (বিশেষভাবে ঋণী) তাঁর জয় বাংলা শ্লোগানের জন্য।১০ আজ দু’জনই শারিরীকভাবে বেঁচে নেই। কিন্তু নজরুলের বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ আছে, আছে বাঙালি। আর আছে সেই অমর শ্লোগান বাণী ‘জয় বাংলা’।

॥১০॥

বঙ্গবন্ধুর প্রিয় নজরুলের লেখা কবিতা ও গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:
১। বিদ্রোহী
২। নারী
৩। সাম্য
৪। কে বলে তোমায় ডাকতে বন্ধু
৫। চল চল চল উর্ধ্বগগনে বাজে মাদল
৬। ‘নম: নম: বাংলদেশ নম:।