ব্রেকিং নিউজঃ

বিদেশে উচ্চ শিক্ষা শেষে গ্রামে এসে কৃষি কাজে সফল আজাদ

আপডেটঃ ৭:৩৪ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ১১, ২০২২

 

রুকুনুজ্জামান খান রুকন :  বারহাট্টা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি ঃ বিদেশে পড়াশোনা শেষে নিজের গ্রামে এসে কৃষিতে মনোনিবেশ করেছেন আজাদ মিয়া। গ্রামে নিজেদের দেড় একর জমিতে বিদেশী জাতের স্ট্রবেরি, ভিয়েতনামী, লাল কাঠাল, কাজু বাদামসহ প্রায় অর্ধশতাধিক জাতের নানা রকমের ফলের চাষ করেছেন। এছাড়া দেশি জাতের টমেটো, শিম, বরবটি, করলা, ফুল কপি, বাঁধাকপি, মুলা, লাউ, পুইশাখ, লালশাখ, ঢেঁড়স, ঝিঙ্গা, বেগুনসহ নানা প্রকারের সবজি। তাছাড়া সবজি ফার্মের ভেতর তৈরি করেছেন একটি গ্রীণ হাউজ। এটিতে বিদেশী অনেক ধরণের ফল চাষ করা যাবে।
নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার সদর ইউনিয়নের গড়মা গ্রামে বসবাস করছেন কৃষক আজাদ মিয়া ও তার ছোট ভাই সাদ ইবনে সাইদ। এই গ্রামে সর্ব প্রথম বিদেশি জাতের সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন তারা। সবজি চাষে বদলে দিয়েছেন গ্রামের চেহারা। তবে ওই গ্রামে তাদের ছাড়াও রয়েছে শতাধিক পরিবার সবাই তাদের মতোই কৃষি কাজ করে। তবে এই গ্রামে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে নিজস্ব পতিত জমিতে দেশীয় পদ্ধতিতে মৌসুমী টমেটো, শিম, বরবটি, করলা, ফুল কপি, বাঁধাকপি, মুলা, লাউ, পুইশাখ, লালশাখ, ঢেঁড়স, ঝিঙ্গা, বেগুনসহ নানা প্রকার সবজি চাষ করছেন। এই গ্রামে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আবাদের পরিমাণও।
এক সময় এই গ্রামের লোকজনরা ধান আবাদের ওপর নির্ভর ছিলেন। ঝড় বৃষ্টি বন্যাসহ নানা প্রতিকুলতায় প্রতি বছর ধান চাষে লোকসান হওয়ায় এ চাষ ছেড়ে সবাই শাক সবজিতে মনোযোগী হন কৃষকরা। এই গ্রামে শাকসবজি চাষে কম শ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করে এখন অনেকেই লাখপতি হয়েছেন। তাছাড়া অনেকে নিজেদের অভাব অনটন ঘুছিয়েছেন। বর্তমানে এখানকার সবজি এ উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। সবজি বিক্রিতে ভালো দাম পাওয়ায় খুশি কৃষকরা। গড়মা গ্রামে সবজি চাষ করে না এমন পরিবার খোঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। এরই মধ্যে গড়মা গ্রামটি সবজির গ্রাম নামে জেলার মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছে।
পুষ্টিমানের দিক থেকে সবজি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল তার মধ্যে যদি থাকে বিদেশি জাতের সবজি তাহলে কেমন হয়। খাবারকে পরিপাকের মাধ্যমে শরীরের গ্রহণ উপযোগী করে তোলার জন্য সবজির বিকল্প নেই। সবজি যে কেবল খাবার পরিপাক করতেই সাহায্য করে তা কিন্তু নয়। আমাদের শরীরের জন্য দরকারি অনেক পুষ্টি উপাদানও যোগান দিয়ে থাকে। রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শরীরকে খাদ্যের শর্করা আমিষ ও চর্বির ব্যবহারে সাহায্য করে। এক সময় ক্ষুদ্র পরিসরে করা হলেও এখন বছর জুড়ে চাষ করে পারিবারিক পুষ্টিচাহিদা মিটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় করছেন এখানকার কৃষকরা। বারহাট্টা উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র বারহাট্টা সরকারি কলেজের পাশেই গড়মা গ্রামে খোরাক এগ্রোফার্মটি। এ গ্রামটি ছোট হলেও বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে সবজি চাষ। এখন শীতের সবজি ভরা মৌসুম হওয়ায় মাঠ জুড়ে শুধু সবজি আর সবজি নজরে পড়ে। এ গ্রামের কৃষক দুই ভাই আজাদ মিয়া ও সাদ ইবনে হুসাইন বিদেশি সবজি চাষে যেন এক নিরব বিল্পব ঘটিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই কৃষক আজাদ মিয়া ও সাদ ইবনে হুসাইন সবজি পরিচর্যাসহ বাজার জাত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের পাশাপাশি নারীরাও বসে নেই ঘরে। তারাও সবজির পরিচর্যাসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করছেন। এসব বিদেশি সবজি চাষ গোটা গ্রামটিকে সাজিয়েছে যেন সবুজ আর সবুজ করে। তাছাড়া এই গ্রামের হতদরিদ্র অনেক লোকজন তাদের জমিতে সবজির চাষ করে তাদের বেকারত্ব গুছিয়েছেন।
বিদেশি সবজি চাষি মো. আজাদ মিয়া জানান, এ মৌসুমে ৩০ শতক জায়গায় বিদেশি সবজি সহ দেশীয় পদ্ধতিতে তিনি শীত কালীন ফুলকপি, মুলা, লাল শাক পুঁইশাকসহ নানা জাতের সবজির আবাদ করেছেন। এরমধ্যে সবজি গাছের অবস্থা এখন পর্যন্ত খুব ভালো রয়েছে। অন্যদিকে মুলা, লাল শাক পুঁইশাক স্থানীয় বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে খরচ বাদে আশা করছি দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ওপর আয় হবে।

তিনি আরো বলেন, ওই জমিতে যদি ধান আবাদ করা হতো তাহলে ১৫ হাজার টাকার বেশি ধান পাওয়া যেতো না। তাই ধান ছেড়ে সবজি আবাদ করছি।
সবজি চাষি সাদ ইবনে হুসাইন জানান, সারা বছরই তিনি মৌসুম অনুযায়ী সবজি চাষ করছেন। এবার তিনি ভাইয়ের সাথে ৩০ শতক জায়গায় বিদেশি সবজি সহ শীতকালীন ফুলকপি, মুলা, লালশাক পুইশাক বেগুনসহ নানা জাতের সবজির আবাদ করেছেন। এরই মধ্যে মুলা, লালশাক বিক্রি শুরু করেছেন। আগাম সবজি চাষ করায় অন্য বছরের তুলনায় এবার বিক্রিতে ভালো দাম পাচ্ছেন। তিনি আশা করছেন প্রাকৃতিক দুরে‌্যাগ না হলে শাকসবজি চাষ করে এ বছর যাবতীয় খরচ বাদে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করতে পারবেন।
বারহাট্টা উপজেলা উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নবজিৎ সাহা রায় বলেন, এই প্রথম বারহাট্টায় খোরাক এগ্রোফার্মের মালিক আজাদ মিয়া ও সাদ ইবনে হুসাইন দুই ভাই মিলে উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় বিদেশি জাতের সবজি চাষ করেছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই সবজি বিক্রি করে লাভবান হবেন তারা, আমরা কৃষি অফিস তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য পাশে আছি এবং থাকবো।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রাকিবুল হাসান বলেন, গড়মা গ্রাম সবজি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। দীর্ঘ বছর ধরে স্থানীয় কৃষকরা নানা জাতের শাকসবজি চাষ করছেন। এ গ্রামের কৃষকরা নিজ উদ্যোগে দেশীয় পদ্ধতিতে সবজি আবাদে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। এবছর গড়মা গ্রামে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিদেশি জাতের সবজি চাষ,আর বিদেশি জাতের সর্ব প্রথম বিদেশি জাতের সবজি চাষ করেছেন কৃষক মোঃ আজাদ মিয়া ও সাদ ইবনে হুসাইন দুই ভাই।
তিনি আরো বলেন উপজেলা কৃষি অধিদফতরের মাধ্যমে কৃষকদেরকে প্রশিক্ষণ, সার, বীজ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অচিরেই আরো নতুন করে কৃষকরা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ সুবিধার আওতায় আসবে। আবহাওয়া অনুকূল এবং বাজার দর ভালো থাকলে শীতকালীন সবজি আবাদে লাভবান হবেন বারহাট্টা উপজেলার কৃষকরা। তবে ফলন ভাল করতে সব সময় কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে।