ভয়-ডরহীন ক্রিকেটে মরুর বুকে লঙ্কা ব্র্যান্ডের জয়গান

আপডেটঃ ১:৩০ পূর্বাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ১২, ২০২২

বল হাতে এগিয়ে আসছেন মাধুশান। ড্রেসিং রুমের সামনে সতীর্থরা দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানো শুরু করেছেন করতালিতে, সঙ্গে শ্রীলঙ্কা-শ্রীলঙ্কা গর্জন। মাধুশান যেন আরও জ্বলে উঠলেন, দারুণ ডেলিভারিতে বোল্ড হারিস রউফ। এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা। এরপর দুবাই স্টেডিয়ামের বর্ণিল আতশবাজি আর চোখ ধাঁধানো ফায়ারওয়ার্কসের মধ্যে চলে লঙ্কান শিবিরের জয়োল্লাস।

নাসিম শাহ-হারিস রউফের তোপে শুরুতে দুবাই স্টেডিয়াম কাঁপছিল পাকিস্তান-পাকিস্তান গর্জনে। সেই চিত্র আর থাকেনি শেষ পর্যন্ত। পাকিস্তানি গর্জন থামিয়ে সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা। আর পাকিস্তানকে শুরুতে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া মাধুশান যেন তুলির আঁচড় দেন। হার আঁচ করতে পেরে ধীরে ধীরে মাঠ ছাড়তে শুরু করেন পাকিস্তানি দর্শকরা। মুহূর্তেই যেন মরুর বুকের দুবাই স্টেডিয়াম রূপ নেয় কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে।

এখানেইতো হওয়ার কথা ছিল এশিয়া কাপের ফাইনাল। অর্থনৈতিক সংকটে সেটা এলো দুবাইয়ে। তাতে কি? দাসুন শানাকার দল পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে ষষ্ঠবারের মতো এশিয়া কাপের ট্রফি জিতলো। এই নিয়ে চারবার ফাইনাল খেলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনবারই হেরেছে পাকিস্তান।

টস জিতে বাবর আজমের ঠোঁটে দেখা গিয়েছিল চওড়া হাসি। কিন্তু প্রত্যেক দিনতো আর সমান যায় না। হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করা আন্ডারডগ শ্রীলঙ্কা ফিয়ারলেস ক্রিকেট খেলে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পেয়েছে। বিশ্ব দেখলো ক্রিকেটের লঙ্কান ব্র্যান্ড। বল হাতে, ব্যাট হাতে কিংবা ফিল্ডিংয়ে সব বিভাগেই ছিল ক্ষীপ্রতা, ভয়-ডরহীন মানসিকতা। সেটিরই জয় হলো শেষ পর্যন্ত। লঙ্কানদের দেওয়া ১৭১ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ইনিংসের শেষ বলে ১৪৭ রানে অলআউট হয় হয় পাকিস্তান।

শেষ চার ওভারে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৬১ রান। ক্রিজে রিজওয়ান-খুশদীল। হাতে আছে ৬ উইকেট। ড্রেসিংরুমে ছিলেন আসিফ আলী। তখনও জয়ের স্বপ্ন বুনছিল পাকিস্তান শিবির। কিন্তু এই ওভারেই যে হাসারাঙ্গা ম্যাচ শেষ করে দেবেন কে ই বা ভেবেছিল। আগের তিন ওভারে ২৫ রান দেওয়া হাসারাঙ্গা দলীয় ১৭তম ওভারে ২ রানে নেন ৩ উইকেট। একে একে সাজঘরে রিজওয়ান, আসিফ আলী ও খুশদীল। ফখর জামানের মতো আসিফ আলীও গোল্ডেন ডাক। এর আগে ব্যাট হাতেও ঘুরে দাঁড়ানোয় দারুণ ভূমিকা রাখেন হাসারাঙ্গা।

২২ রানে ২ উইকেট হারানোর পর রিজওয়ান-ইফতেখার জুটি গড়ে এগোচ্ছিলেন। তবে তাদের জুটি ছিল মন্থর। ৫৯ বলে যোগ করেন ৭১। চাপে পড়ে যায় পাকিস্তান। সেই চাপ আর সামলে উঠতে পারেনি বাবরের দল। সর্বোচ্চ ৫৫ রান করেন রিজওয়ান। এ ছাড়া ৩২ রান আসে ইফতিখারের ব্যাট থেকে। তৃতীয় সর্বোচ্চ রান আসে পেসার হারিস রউফের ব্যাট থেকে। আর কোনো ব্যাটসম্যান দুই অঙ্কের ঘর ছুঁতে পারেননি।

৪ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে সর্বোচ্চ ৪ উইকেট নেন মাদুশান। এ ছাড়া হাসারাঙ্গা ২৭ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। অথচ শ্রীলঙ্কার শুরুটা হয়েছিল খুবই বাজে। নাসিম শাহ, হারিস রউফ ও মোহাম্মদ হাসনাইনের গতির তোপে শুরুতে এলোমেলো শ্রীলঙ্কা। আক্রমণাত্বক বোলিংয়ে চোখে-মুখে যেন সর্ষে ফুল দেখছিলেন লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা। একেকজন বোলিং করছিলেন ১৪৫ থেকে ১৫০ কিলোমিটার বেগে। শুরুতেই নাসিমের এক দারুণ ইনসুইংয়ে বোল্ড কুশাল মেন্ডিস (০)।

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দারুণ ছন্দে থাকা এই ব্যাটসম্যানের শুরুতেই আউট হওয়া ছিল বড় ধাক্কা। হাসির রউফের শিকার হয়ে ফেরেন পাথুম নিসানকা (৮) ও দানুশকা গুনাথিলাকা (১)। খেলার হাল ধরার চেষ্টায় ছিলেন ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা। তাকে ২৮ রানে থামিয়ে দেন ইফতিখার। আর ক্রিজের এসেই দাসুন শানাকা (২) শিকার শাদাবের।

৯ ওভার শেষ না হতেই ৫৮ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলে শ্রীলঙ্কা। এখানেই শেষ ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গকে সঙ্গে নিয়ে পাশার দান উলটে দেন ভানুকা রাজাপাকসে। ইনিংস শেষে সেই স্কোর দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ১৭০! বাকি ১১.১ ওভারে উইকেট পড়েছে মাত্র ১টি আর রান হয়েছে ১১২টি। রাজাপাকসে-হাসারাঙ্গার জুটি থেকে আসে ৩৬ বলে ৫৮ রান। তাতে মাত্র ২১ বলে হাসারাঙ্গার অবদান ৩৬।

হাসারাঙ্গা ফিরলেও রানের চাকা থামেনি লঙ্কানদের। এবার রাজাপাকসের সঙ্গী চামিকা করুণারত্নে। দুজনে ৩১ বলে ৫৪ রান যোগ করে ইনিংস শেষ করে আসেন। ৪৬ ও ৫১ রানে জীবন পাওয়া রাজাপাকসে থামেন ৪৫ বলে ৭১ রান করে। ইনিংসের ইতি টানেন নাসিম শাহকে চার-ছয় হাঁকিয়ে। চামিকা অপরাজিত ছিলেন ১৪ রানে। পাকিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ ৩ উইকেট নেন রউফ।